আকাশ তখন দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের চূড়ান্ত পর্বের ছাত্র। দীর্ঘ ৫টি বছর সে রিয়ার সাথে একটি গভীর এবং বিশ্বস্ত সম্পর্কের মধ্যে ছিল। আকাশ মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় পড়াশোনা শেষ করে একটি ভালো চাকরি পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, কিন্তু বাস্তবতার খাতিরে তার কিছুটা সময় লাগছিল। ঠিক এই কঠিন সময়টিতে রিয়া তাকে মানসিকভাবে সহযোগিতা করার পরিবর্তে, কোনো কিছু না জানিয়ে এবং কোনো আলোচনা ছাড়াই পারিবারিকভাবে এক প্রতিষ্ঠিত এবং বিত্তশালী ব্যবসায়ীর সাথে
বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে চলে যায়। চলে যাওয়ার প্রাক্কালে রিয়ার শেষ কথাগুলো ছিল অত্যন্ত নির্মম, সে বলেছিল—"বাস্তবতা অনেক কঠিন আকাশ, তোমার এই অনিশ্চিত ক্যারিয়ারের সাথে আমার ভবিষ্যৎ অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নয়।" এই আকস্মিক এবং তীব্র ধোঁকা আকাশকে এক গভীর মানসিক অবসাদের (Clinical Depression) দিকে ঠেলে দিয়েছিল। জীবনের প্রথম কয়েক মাস তার চারপাশের সবকিছু সম্পূর্ণ থমকে গিয়েছিল, পড়াশোনা এবং ক্যারিয়ারের প্রতি তার সমস্ত মনোযোগ হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একসময় সে অনুধাবন করতে পারল যে, এভাবে নিজেকে শেষ করে দিলে প্রতারণাকারী মানুষটিই জিতে যাবে। সে তার ভেতরের সমস্ত কষ্ট, একাকীত্ব এবং জমে থাকা ক্ষোভকে এক তীব্র জেদে রূপান্তর করল। দিন-রাত এক করে সে সিভিল সার্ভিসের জন্য পড়াশোনা শুরু করল এবং নিজেকে বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের পর ২ বছর শেষে আকাশ আজ একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারি গেজেটেড কর্মকর্তা (বিসিএস ক্যাডার) হিসেবে কর্মজীবনে পদার্পণ করেছে। আজ রিয়া তার জীবনের সেই ভুলের জন্য এবং আকাশকে অবমূল্যায়ন করার জন্য মনে মনে তীব্র আফসোস করে, কিন্তু আকাশের জীবনে এখন তার চেয়েও অনেক বেশি পরিপক্ব, সৎ এবং ভালো মনের মানুষের আগমন ঘটেছে। মনোবিজ্ঞান বলে, যখন কেউ আপনাকে আপনার পরিস্থিতির কারণে ছেড়ে চলে যায়, তখন ভেঙে না পড়ে নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধি করাই হলো সবচেয়ে বড় এবং উপযুক্ত জবাব।
সুমাইয়া তার অফিসের এক সিনিয়র সহকর্মীকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতো এবং অন্ধের মতো বিশ্বাস করেছিল। সম্পর্কের দীর্ঘ ৩টি বছর সে তার নিজের উপার্জিত জমানো টাকা, ক্যারিয়ারের সুযোগ এবং মানসিক সমর্থন—সবকিছুই নিঃস্বার্থভাবে সেই ছেলেটির পেছনে ব্যয় করেছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার মাধ্যমে সে জানতে পারে যে, ছেলেটি একই সাথে অন্য আরেকজন মেয়ের সাথেও প্রেমের সম্পর্কে লিপ্ত এবং সুমাইয়াকে সে কেবলই নিজের আর্থিক সুবিধা এবং ক্যারিয়ারের স্বার্থে ব্যবহার করছিল। এই চরম এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বিশ্বাসঘাতকতা সুমাইয়াকে মানসিকভাবে একদম ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিল। সে
এতটাই ট্রমার মধ্যে চলে গিয়েছিল যে নিজের চাকরিটি ছেড়ে দেয় এবং মাসের পর মাস নিজেকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে ফেলে। তীব্র একাকীত্ব এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব তাকে গ্রাস করতে শুরু করেছিল। কিন্তু এই অন্ধকার সময়ে তার এক পরম বান্ধবীর সহায়তায় সে একজন পেশাদার মানসিক চিকিৎসকের কাছে কাউন্সিলিং নেওয়া শুরু করে। থেরাপির মাধ্যমে সুমাইয়া ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে, একজন ভুল এবং স্বার্থপর মানুষের কৃতকর্মের জন্য নিজের মূল্যবান জীবনকে ধ্বংস করার কোনো মানে হয় না। সুমাইয়া সবসময় কেক এবং পেস্ট্রি বানাতে ভালোবাসতো, সে তার এই সুপ্ত শখকে একটি স্বাধীন ব্যবসায় রূপান্তর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। সে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে "মায়াবী কেক হাউজ" নামে একটি অনলাইন পেজ চালু করে এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে মানসম্মত সেবা দিতে শুরু করে। আজ সুমাইয়া একজন অত্যন্ত সফল নারী উদ্যোক্তা, যার প্রতি মাসের আয় লক্ষাধিক টাকা এবং তার এই প্রতিষ্ঠানে আরও ৫ জন অসহায় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। সে আজ সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছে যে, ভালোবাসার ধোঁকা বা একটি সম্পর্কের নির্মম অবসান মানুষের জীবনকে চিরতরে শেষ করে দিতে পারে না, বরং এটি মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক নতুন এবং শক্তিশালী জীবনের সূচনা করে দেয়।
ফাহিম এবং তানিয়ার সম্পর্কের সূত্রপাত হয়েছিল একদম স্কুলজীবন থেকে, যা সময়ের সাথে সাথে একটি গভীর ভালোবাসায় রূপ নিয়েছিল। দীর্ঘ ৭টি বছরের এই সাজানো সম্পর্কটি হঠাৎ করেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়, যখন তানিয়া কোনো স্পষ্ট কারণ না দেখিয়ে বা কোনো প্রকার আলোচনার সুযোগ না দিয়ে ফাহিমকে সমস্ত যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ব্লক করে দেয় এবং অন্য একজন বিত্তশালী মানুষের সাথে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ফাহিমের কাছে এই ঘটনাটি ছিল আকাশ ভেঙে পড়ার মতো এক ভয়াবহ মানসিক আঘাত। সে রাতে চোখ বন্ধ করলেই পুরনো স্মৃতিগুলো তাকে তাড়া করত, সে ঘুমাতে পারত না, ঘনঘন প্যানিক অ্যাটাক হতো এবং একপর্যায়ে তীব্র মানসিক যন্ত্রণার কারণে আত্মহত্যার নেতিবাচক চিন্তাও তার মাথায় আসতে শুরু করেছিল। তবে ফাহিম সময়মতো বুঝতে পেরেছিল যে তার একা পক্ষে এই তীব্র মানসিক ট্রমা এবং ডিপ্রেশন কাটিয়ে ওঠা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সে লোকলজ্জা এবং সমাজের ট্যাবুকে ভয় না পেয়ে একজন প্রফেশনাল সাইকোলজিস্ট বা মনস্তাত্ত্বিকের শরণাপন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। নিয়মিত সাইকোথেরাপি, সঠিক কাউন্সেলিং এবং প্রতিদিনের
মেডিটেশনের মাধ্যমে ফাহিম ধীরে ধীরে জীবনের প্রকৃত অর্থ বুঝতে শুরু করে। সে অনুধাবন করে যে মন খারাপ হওয়া বা একটি দীর্ঘ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া মানেই জীবনের শেষ নয়, এটি জীবনের একটি কঠিন পরীক্ষামাত্র। সে নিজের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হতে শুরু করে এবং নিয়মিত জিমে যাওয়া শুরু করে। কঠোর শারীরিক পরিশ্রম এবং নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনের মাধ্যমে বর্তমানে ফাহিম একজন সার্টিফাইড ফিটনেস ট্রেইনার এবং মানসিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী একজন মানুষে পরিণত হয়েছে। ফাহিম এখন অন্য স্তরের মানুষদেরও ডিপ্রেশন থেকে বের হয়ে আসার মেন্টরিং করে এবং সে সর্বদা একটি কথাই বলে যে—মানসিক রোগ বা ব্রেকআপের কষ্ট কোনো পাপ বা লজ্জার বিষয় নয়, বরং সঠিক সময়ে পেশাদার সাহায্য নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোই হলো প্রকৃত বীরত্ব।
যদি ভালো লাগে
এরকম লেখা আরো তৈরি করব
লেখক মোঃ কাশেম

